Vatbondhu News
প্রকাশ : Oct 17, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

গোল্ড ও পাসপোর্ট: বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তন কি অনিবার্য?

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ক্ষমতার কেন্দ্র কখনোই স্থির ছিল না। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, প্রযুক্তি কিংবা কূটনীতি — সময়ের সাথে ক্ষমতার রূপ ও উৎস পাল্টে গেছে। ২১শ শতাব্দীর বিশ্বে এখন দুটি সূচক ক্রমেই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে — গোল্ড (স্বর্ণ রিজার্ভ) ও পাসপোর্ট পাওয়ার (ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার)।
দুটি সূচকই কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক আস্থা ও কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন।
একটি দেশের হাতে যত বেশি সোনা, তার মুদ্রা তত স্থিতিশীল; আর পাসপোর্ট যত শক্তিশালী, তার নাগরিক ও রাষ্ট্র তত বেশি গ্রহণযোগ্য।
এই বিশ্লেষণে দেখা যাবে — অর্থনৈতিক সোনার ভাণ্ডার ও পাসপোর্টের শক্তির পরিবর্তন একসঙ্গে ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্বে সরে যাচ্ছে।

স্বর্ণ: অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রাচীন ও আধুনিক মানদণ্ড
স্বর্ণ সব যুগেই শক্তি, স্থিতি ও আস্থার প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো ছিল স্বর্ণ-ভিত্তিক অর্থনীতির শীর্ষে।
১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছিল ২০,৫০১ মেট্রিক টন স্বর্ণ, যা ছিল বিশ্ব রিজার্ভের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
অপরদিকে, ভারত, চীন বা জাপানের মতো দেশগুলোর অবস্থান ছিল প্রান্তিক — তখনও তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত, ঔপনিবেশিক বা পুনর্গঠনের পর্যায়ে।

কিন্তু ২০২৫ সালে চিত্র পুরো উল্টে গেছে।
দেশ ১৯৫১ সালে (মেট্রিক টন) ২০২৫ সালে (মেট্রিক টন) যুক্তরাষ্ট্র ২০,৫০১ — ৮,১৩৩,  জার্মানি ১,২৮৮ — ৩,৩৫১, ইতালি ৩০০– ২,৪৫১,  চীন ২৪০ —২,২৬৫, ভারত- ১২০ —৮৭৬, জাপান- ৯০— ৮৩৪
সুইজারল্যান্ড - ১,০৭৮– ১,০৪০

বিশ্লেষণ:
পশ্চিমা অর্থনীতির রিজার্ভ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, কারণ তাদের মুদ্রা এখন মূলত ঋণভিত্তিক।
চীন, রাশিয়া ও ভারত স্বর্ণে বিনিয়োগ বাড়িয়ে “ডলারবিমুক্ত অর্থনীতি (De-dollarization)”-এর দিকে এগোচ্ছে।
গোল্ড এখন কেবল ব্যাংকের সম্পদ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতিরক্ষা বলয়।

পাসপোর্ট পাওয়ার: কূটনৈতিক আস্থার সূচক
পাসপোর্ট র‍্যাংকিং এখন একটি দেশের সফট পাওয়ার সূচক — একটি রাষ্ট্রের প্রতি বৈশ্বিক আস্থার মাপকাঠি।
২০২৫ সালের শীর্ষ ১০ পাসপোর্ট
১. সিঙ্গাপুর (১৯৩ দেশ), ২. জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া (১৯০ দেশ), ৩. জার্মানি, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, ইতালি, স্পেন (১৮৯ দেশ), ৪. যুক্তরাজ্য (১৮৬ দেশ)
৫. যুক্তরাষ্ট্র (১৮২ দেশ), 

অপরদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থান একদম নিচে —
বাংলাদেশ ১০০তম, ভারত ৮৫তম, পাকিস্তান ১০৩তম, আফগানিস্তান ১০৬তম।

বিশ্লেষণ:
সিঙ্গাপুর ও জাপানের উত্থান এসেছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ভারসাম্য, শিক্ষা ও শাসনব্যবস্থার স্থিতি থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের র‍্যাংক কমে যাওয়া দেখাচ্ছে — রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে শুধু সামরিক শক্তি নয়, আন্তর্জাতিক আস্থা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।

গোল্ড ও পাসপোর্ট — একে অপরের ছায়াসঙ্গী
এই দুই সূচক আলাদা মনে হলেও বাস্তবে একে অপরকে প্রভাবিত করে।

সূচক প্রতিফলন রাজনৈতিক অর্থ গোল্ড রিজার্ভ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মুদ্রার নির্ভরযোগ্যতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিরতা পাসপোর্ট শক্তি কূটনৈতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা আস্থা ভ্রমণ, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি, দু’য়ের সংমিশ্রণ Geoeconomic Power অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি

অর্থাৎ, একটি দেশের অর্থনীতি যত স্থিতিশীল, তার পাসপোর্ট তত গ্রহণযোগ্য।
এবং পাসপোর্ট যত শক্তিশালী, সেই দেশ তত সহজে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করে — এটি এক ধরনের দ্বিমুখী শক্তি চক্র।

কেন এই পরিবর্তন অনিবার্য

১. ডলার নির্ভরতা থেকে মুক্তি:
চীন, রাশিয়া, ভারতসহ বহু দেশ এখন গোল্ড ও স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করছে।
২. আঞ্চলিক জোট ও ব্লক রাজনীতি:
BRICS ও ASEAN এখন পশ্চিমা প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে।
৩. নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা:
উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও শিক্ষাভিত্তিক কূটনীতি এখন সামরিক কূটনীতিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
৪. দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা:
বৃহৎ জনসংখ্যা ও বাজার থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা পাসপোর্ট শক্তি বাড়াতে বাধা দিচ্ছে।

ফলাফল ও ভবিষ্যৎ
বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র এশিয়ামুখী হচ্ছে।
সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, চীন, ভারত এখন নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।
পশ্চিমা বিশ্বের ক্ষমতা কমছে কিন্তু প্রভাব রয়ে গেছে। তারা প্রযুক্তি, সামরিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, তবে অর্থনৈতিক নেতৃত্ব হারাচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বার্তা:
যদি এই অঞ্চল দ্রুত কূটনৈতিক সংস্কার, প্রশাসনিক আস্থা ও আঞ্চলিক একতা গড়ে তুলতে পারে, তবে পরবর্তী দশকে অবস্থান উন্নত করা সম্ভব।
উপসংহার
গোল্ড ও পাসপোর্ট এখন নতুন যুগের রাজনৈতিক সূচক। গোল্ড অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক, পাসপোর্ট কূটনৈতিক বিশ্বাসের প্রতীক — আর এই দুইয়ের মিলন ঘটাচ্ছে নতুন বিশ্বশক্তির উদ্ভব।

এই প্রবাহ আর থামানো যাবে না।
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তন এখন অর্থনৈতিক আস্থা ও মানবিক গতিশীলতার ওপর নির্ভর করছে।
যে দেশ আস্থা অর্জন করতে পারবে — সে-ই হবে আগামী দিনের রাজনৈতিক শক্তি।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অজ্ঞতা ও রাজস্ব আইনের আগ্রাসন: মো: আলীমুজ্জামান

1

কর বাড়িয়ে তামাক বন্ধ সম্ভব নয়, প্রয়োজন ইনোভেটিভ আইডিয়া

2

দুর্বল ব্যাংকের গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাবেন: গভর্নর

3

এয়ার পিউরিফায়ার আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে সহজলভ্য করল এনবিআর

4

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

5

আমদানিমূল্য পরিশোধের সময় বাড়ালো কেন্দ্রীয় ব্যাংক

6

আরও ১৪ সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব

7

সাংবাদিকদের দ্রুত অ্যাক্রিডিটেশন প্রদানের আহ্বান অনলাইন এডিট

8

মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কাজ করছে অন্তর্বর্তী সরকার

9

প্রধান উপদেষ্টাকে মার্চে বেইজিং সফরে নিতে আগ্রহী চীন

10

আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে : আলী রীয়াজ

11

বিশ্বকাপ নিয়ে রিভালদোর সঙ্গে তর্কে জড়ালেন নেইমার

12

তেল, আটা-ময়দা, গ্যাসসহ কিছু পণ্যে ভ্যাট তুলে দিলো এনবিআর

13

২০% প্লাস্টিক কারখানা বন্ধের পথে, ভ্যাট কমানোর দাবি মালিকদে

14

পুতিন-কিমের সঙ্গে চুক্তি চান ট্রাম্প

15

ভ্যাট ব্যবস্থায় বাস্তব অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনের সমন্বয় জরুরি : ম

16

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে জানলেন তিনি ‘মৃত’

17

সংস্কার কমিশনে ২২ দফা সংস্কার প্রস্তাবনা দিলো মুক্ত গণমাধ্য

18

উইন-উইন সমাধানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে শুল্ক-চুক্তি করতে আগ্রহী ঢ

19

শুল্ক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা চালু

20