বাস্তব কদম আলী ছাদের এক কোনায় একটা পুরোনো চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটা তীব্র আলোর ঝলকানি দিয়ে ছাদ কাঁপিয়ে ল্যান্ড করল এলিয়েন কদম আলীর ইউএফও। এলিয়েন আজ বেশ ভাব নিয়ে, চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে স্পেসশিপ থেকে নামল। তার হাতে একটা অদ্ভুত ডিজিটাল মাপকাঠি, যা থেকে লাল-নীল আলো জ্বলছে আর নিভছে।
এলিয়েন কদম আলী: গুড ইভনিং, বাস্তব কদম ভাই! আজ একটু বিশেষ ভাব নিয়ে আসলাম। অনেক দিন ধরে একটা জিনিস নিয়ে গবেষণা করতেছি। আচ্ছা, তোমাদের দেশে কি "শতভাগ সৎ করদাতা" মাপার কোনো পরিমাপক যন্ত্র বা স্কেল আছে?
বাস্তব কদম আলী: কী বললা? সৎ করদাতা মাপার যন্ত্র? এইটা আবার কেমন কথা?
এলিয়েন কদম আলী: আরে কদম ভাই, আমি হিসাব করে দেখলাম—এই সৌরজগতে যত তারা, তোমাদের এই দেশের কর আইনে আছে তত ধারা! প্রতিটা ধারার নিচে আবার উপধারা, তার নিচে আবার বিশেষ পরিপত্র! আইন তো না, যেন আমাজনের জঙ্গল! যত ভেতরে যাবা, তত হারাইয়া যাবা। এই জঙ্গলের ভেতর দিয়া কোন কদম আলী কতখানি সততা বাঁচাইয়া পার হইতে পারল, সেইটা মাপার কি কোনো থার্মোমিটার আছে তোমাদের এনবিআর (NBR)-এর কাছে?
বাস্তব কদম আলী: আহা! এলিয়েন ভাই রে, আজকে তুমি একদম খাঁটি কথা বলছ। সৌরজগতের তারার চেয়েও আমাদের আইনের ধারা বেশি, এইটা একবিন্দু মিথ্যা না। তবে শোনো, আমাদের দেশে সৎ করদাতা মাপার কোনো আলাদা যন্ত্র লাগে না। যে কদম আলীর পকেট সবসময় খালি থাকে, আর যে মাসের শেষে ট্যাক্সের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারে না—ধরে নিবা সেই-ই এ দেশের শতভাগ সৎ করদাতা! কারণ অসৎদের পকেটে তো টাকার পাহাড়, তাদের কোনো চিন্তাই নাই।
এলিয়েন কদম আলী: তা অবশ্য ঠিক বলছ। কিন্তু কদম ভাই, আজ আসার সময় নিচের রাস্তা দিয়ে আসার সময় শুনলাম, তোমরা নাকি পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়েও কী যেন একটা আইনের প্যাঁচে পড়ছ? ওই যে দাদা-পড়দাদার আমলের সম্পত্তি?
বাস্তব কদম আলী: আরে ওইটাই তো আসল গ্যাঁড়াকল! তুমি তো শুনছ শুধু জমি ডেভেলপ করতে দিলে ১৫% ট্যাক্স। আজ শুনো নতুন কাহিনী। আমি বললাম—পৈত্রিক সম্পত্তি, মানে বাপ-দাদার আমল থেকে যে জমিটা আমাগো পরিবারে আছে, সেইটা যদি আমি এখন ভাইবোনদের মধ্যে ভাগ করি, কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারী রাইখা সেইখানে কোনো কাজ করতে যাই, এমনকি নিজের দাদার সম্পত্তি নিজের নামে নামজারি করতে যাই—সেখানেও নাকি এখন ট্যাক্স লাগবো! কর্মকর্তা কয়, "দাদার সম্পত্তি হইলেও ট্যাক্স লাগবো, আইন পড়েন নাই?" আমি বললাম, "আইন পড়ুম কোন সময়? দিনরাত কামাই কইরা ট্যাক্সের টাকা জোগাড় করতেই তো জীবন শেষ!"
এলিয়েন কদম আলী: ওরে বাপরে! পৈত্রিক সম্পত্তিতেও ট্যাক্স? মানে যে দাদা আজ থেকে ৫০ বছর আগে মারা গেছেন, তার রেখে যাওয়া ভিটায় যদি তুমি একটা লাউ গাছও লাগাও, তার ওপরও ট্যাক্স দিতে হবে? তোমাদের দেশের আইন প্রণেতারা কি তাহলে স্বপ্নের মধ্যেও করের ধারা বানায়?
বাস্তব কদম আলী: স্বপ্নের কথা বাদ দাও ভাই, এরা বাস্তবে যা করে তা-ই রূপকথা! দাদা যখন জমিটা কিনেছিলেন, তখন তিনি তার জীবনের বৈধ কামাইয়ের টাকা দিয়ে সব ট্যাক্স-খাজনা পরিশোধ করেই কিনেছিলেন। বাবা যখন পাইলেন, তখনও খাজনা দেওয়া হইছে। এখন আমি যখন সেই পৈত্রিক সম্পত্তির অংশ বুঝে নিতে যাচ্ছি, তখন বর্তমানের কর্মকর্তারা এসে ফাইলের ওপর ফাইল চাপিয়ে বলে—"হবে না, উঁহু, হবে না! আগে ট্যাক্স ক্লিয়ার করেন, সোর্সে ট্যাক্স দেন, গেইন ট্যাক্স দেন!" আইনি মারপ্যাঁচ এমনভাবে সাজানো হইছে যে, নিজের বাপের সম্পত্তিও এখন নিজের মনে হয় না। মনে হয় আমি সরকারের জমিতে ভাড়াটিয়া হিসেবে আছি, আর প্রতি বছর ভাড়ার টাকা ট্যাক্স হিসেবে জমা দিচ্ছি!
এলিয়েন কদম আলী: কদম ভাই, তোমাদের এই সিস্টেম দেখে আমার মাথার এন্টেনা দিয়ে এখন ধোঁয়া বের হওয়া শুরু করছে। আমাদের গ্রহে পৈত্রিক সম্পত্তি হস্তান্তর মানে হলো পরিবারের আনন্দ উৎসব। আর তোমাদের এখানে পৈত্রিক সম্পত্তি পাওয়া মানে হলো—আদালতের বারান্দায় জুতার তলা ক্ষয় করা আর ট্যাক্স অফিসের কেরানির টেবিলের নিচে ‘স্পেশাল ট্যাক্স’ বা স্পিড মানি দেওয়া!
বাস্তব কদম আলী: ওই ‘স্পেশাল ট্যাক্স’ বা ঘুষের কথা তো বাদই দিলাম ভাই। সেইটা তো অলিখিত আইন। আমি বলতেছি লিখিত আইনের কথা। একটা সাধারণ মানুষ তো আর আইনজ্ঞ না। সে তো আর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট কিংবা কর আইনজীবী না। সে তার সোজা বুদ্ধিতে বোঝে—আমার দাদার জমি, আমি খামু। কিন্তু যখনই সে কোনো দপ্তরে যায়, তখনই কর্মকর্তারা মোটা মোটা আইনের বই দেখাইয়া বলে—"এই ধারার ৫ নম্বর উপধারার ‘ক’ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপনার এই সম্পত্তি এখন করযোগ্য!" আইন এমন এক গোলকধাঁধা যে, সাধারণ মানুষ সেখানে ঢুকলে আর জ্যান্ত বের হইতে পারে না।
এলিয়েন কদম আলী: হা হা হা! কদম ভাই, তার মানে তোমাদের দেশের আইনগুলো তৈরিই করা হইছে সাধারণ মানুষকে ‘ধরা’ খাওয়ার জন্য? যারা বড় চোর, তারা তো বড় বড় উকিল ভাড়া করে আইনের ফাঁক গলে বের হয়ে যায়। আর তোমার মতো কদম আলীরা "দাদার সম্পত্তি" বলে বুক ফুলাইয়া যায় আর সোজা ফাঁদে পইড়া যায়!
বাস্তব কদম আলী: একদম ১০০ ভাগ সত্যি কথা। কর্মকর্তা যখন আমারে বলল, "আইন পড়েন নাই?" তখন আমার ইচ্ছা করতেছিল বলি—"ভাই, আইন পড়লে তো আমি আজ ট্যাক্স অফিসে না থাইকা কোনো বড় কর্পোরেট হাউজের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হইতাম!" আমরা হইলাম আমজনতা। আমরা খাটি, আমরা ট্যাক্স দিই দেশের উন্নয়নের জন্য। কিন্তু দেশের উন্নয়ন দেখতে দেখতে আমাদের নিজেদের পারিবারিক উন্নয়ন যে মাইনাসে চইলা যাইতেছে, সেইটা দেখার কেউ নাই। বাপের ভিটা বিক্রি করে যদি ট্যাক্সই শোধ করা লাগে, তবে সেই সম্পত্তি দিয়া আমি কী করমু?
এলিয়েন কদম আলী: কদম ভাই, আজ আমি সত্যি একটা নতুন থিওরি পাইলাম। তোমাদের দেশে "শতভাগ সৎ করদাতা" মাপার আসল স্কেল হলো—কার কপালে কত বেশি চিন্তার ভাঁজ পড়ছে! যার কপালে যত ভাঁজ, সে তত বড় সৎ করদাতা। আর পৈত্রিক সম্পত্তির ওপর এই যে করের জুলুম, এইটা যদি আমাদের গ্রহে হইতো, তবে পুরো গ্যালাক্সিতে যুদ্ধ লাইগা যাইতো!
বাস্তব কদম আলী:আমাদের এখানে যুদ্ধ হয় না ভাই, আমাদের এখানে শুধু আমজনতার পকেট যুদ্ধ হয়। পকেটের ভেতরের টাকা আর বাইরের ট্যাক্সের যুদ্ধ!
এলিয়েন কদম আলী: চলি কদম ভাই! আজ আর বেশি কথা বাড়াবো না। আমার এই ডিজিটাল স্কেলটা তোমাদের এনবিআর (NBR)-এর সামনে রাইখা যামু ভাবছিলাম, কিন্তু ভয় লাগতাছে—তারা আবার এই ভিনগ্রহের যন্ত্রের ওপর ১৫% ‘ইমপোর্ট ডিউটি’ আর ১০% ‘লাক্সারি ট্যাক্স’ বসায় দেয় কি না! তার চেয়ে এইটা আমার কাছেই থাক। সাবধানে থাইকো, আর দাদার সম্পত্তির দলিলটা লুকিয়ে রাখো, কখন আবার কোন কর্মকর্তা এসে বলে—দলিলের কাগজের ওপর ‘কাগজ ট্যাক্স’ দিতে হবে!
বাস্তব কদম আলী: হা হা হা, যা বলছ ভাই! সাবধানে যাও। শুভ রাত্রি!