Vatbondhu News
প্রকাশ : Apr 21, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

মহাকাশ বনাম মতিঝিল: তৃতীয় পর্ব: অ্যাসাসমেন্টের মায়া ও রেফারেন্স ভ্যালুর ফাঁদ"

ঢাকার আকাশ আজ একটু বেশিই কুয়াশাচ্ছন্ন, যেন এক ধোঁয়াশাপূর্ণ রাজস্ব বাজেট চারপাশকে ঢেকে রেখেছে। কদম আলী ছাদের এক কোণে বসে এলিয়েন বন্ধুর কথাগুলোই ভাবছিলেন। হঠাৎ মাথার ওপর সেই পরিচিত মহাজাগতিক গুঞ্জন—রুপালি চাকতিটা আবার নেমে এসেছে। লেজার মই বেয়ে নিচে নেমে এলেন এলিয়েন কদম আলী। তার চারটা অ্যান্টেনার একটা আজ জ্যামিতিক নকশায় কাঁপছে।

মহাকাশ বনাম মতিঝিল: তৃতীয় পর্ব
অ্যাসাসমেন্টের মায়া ও রেফারেন্স ভ্যালুর ফাঁদ"
কদম আলী:(উচ্ছ্বসিত হয়ে) আরে এলিয়েন ভাই! তুই আসবি জানতাম। কাল সারারাত তোর ওই 'সিস্টেম ট্রাস্ট' নিয়ে ভেবেছি। কিন্তু আমার মনে একটা খটকা রয়ে গেছে রে ভাই।
এলিয়েন কদম:(একটা ভাসমান চেয়ারে বসতে বসতে) খটকা তো থাকবেই কদম। তোদের গ্রহের জটিলতা তো আর এক দিনে শেষ হবে না। বল, তোর মাথায় কোন মহাজাগতিক প্যাঁচ লেগেছে?
কদম আলী:শোন, তুই কাল বললি যে ডাটা মিল না থাকলে রিস্ক মডিউল কাজ করবে না। তা আমি ভাবলাম, যদি সরকার কোনোভাবে সব ডাটা মিলিয়ে ফেলে? ধর, কাস্টমস, ভ্যাট আর ব্যাংক—সবগুলোর ডাটা একদম কাঁটায় কাঁটায় মিলে গেল। তখন তো আর রিস্ক মডিউলের কোনো সমস্যা থাকার কথা না, তাই না? তখন তো সব সমাধান হয়ে যাবে!
এলিয়েন কদম:(মাথার অ্যান্টেনাগুলো লাল করে অট্টহাসি দিল) হা হা হা! কদম রে, তুই তো দেখছি এখনো তোদের এনবিআরের সেই 'গাণিতিক মরীচিকা'র মধ্যে আছিস। ডাটা মিলে যাওয়া মানেই যে পদ্ধতি সঠিক, তা কিন্তু নয়। তোদের কাস্টমসের গোড়াতেই তো একটা বিশাল 'ব্ল্যাক হোল' বা কৃষ্ণগহ্বর আছে।
কদম আলী:(অবাক হয়ে) গোড়ায় গলদ? সেটা আবার কী?
*এলিয়েন কদম:* শোন, আমাদের গ্যালাক্সি-৯ এ যখন কোনো পণ্য এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে যায়, তখন আমরা তার কর নির্ধারণ করি **'অ্যাকচুয়াল পেমেন্ট'এর ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ তুই ওই পণ্যের জন্য ব্যাংক দিয়ে কত টাকা পাঠালি, ঠিক সেই মূল্যের ওপর কর বসে। একে বলে পেমেন্ট বেসড সিস্টেম'। কিন্তু তোদের এই গ্রহে যা দেখলাম, তা তো রীতিমতো জাদুকরী!
কদম আলী:জাদুকরী মানে? একটু খুলে বল তো ভাই।

এলিয়েন কদম: তোদের কাস্টমসে কোনো পণ্য এলে ওরা তোদের ইনভয়েস বা পেমেন্ট ডাটা বিশ্বাসই করে না! ওরা দেখে ওদের নিজেদের একটা *'রেফারেন্স ভ্যালু'। তুই হয়তো একটা যন্ত্র কিনেছিস ৮০ ডলারে এবং ব্যাংক দিয়ে সেই ৮০ ডলারই পাঠিয়েছিস। কিন্তু তোদের কাস্টমস অফিসার বলবে— "না বাপু, আমাদের ডাটাবেজে এই যন্ত্রের দাম ১০০ ডলার লেখা আছে, তাই তোমায় ১০০ ডলারের ওপরই শুল্ক দিতে হবে!" এটাকে তোরা বলিস *'অ্যাসাসমেন্ট'। 

কদম আলী: হ্যাঁ, ওটা তো সবসময় হয়! বেশি দাম ধরে ট্যাক্স আদায় করা তো আমাদের চিরাচরিত নিয়ম। কিন্তু এতে সমস্যা কী? ডাটা তো মিলছেই!
এলিয়েন কদম:(ট্যাবলেটে একটা জটিল গ্রাফ বের করল) সমস্যাই তো এখানে! ডাটা মিলছে কিন্তু তা 'কাল্পনিক' মূল্যের ওপর। এখানেই তোর System Trust"চুরমার হয়ে যায়। দেখ কদম:
১. তুই পেমেন্ট করলি ৮০ ডলার।
২. কাস্টমস জোর করে ভ্যালু বসাল ১০০ ডলার (ওভার ভ্যালুয়েশন)।
৩. তুই কর দিলি ১০০ ডলারের ওপর।
৪. এখন যখন তুই এই মালটা বাজারে বিক্রি করবি, তোর কেনা দাম তো আসলে ৮০ ডলার, কিন্তু কাগজে কলমে দাম হয়ে আছে ১০০ ডলার।
এখন বল, তোর ভ্যাট রিটার্ন বা রিস্ক মডিউল কোন ডাটা নেবে? সে দেখবে কাস্টমসের সেই ১০০ ডলার। কিন্তু তোর ব্যাংক স্টেটমেন্ট বলবে ৮০ ডলার। এই যে ২০ ডলারের একটা ব্যবধান তৈরি হলো—এটা কি কোনো সফটওয়্যার মেলাতে পারবে?

কদম আলী:ওরে সর্বনাশ! তার মানে পেমেন্ট বেজড ডাটা না হলে সব তথ্যই তো আসলে সাজানো বা কৃত্রিম! 
এলিয়েন কদম:একদম ঠিক! তোদের কাস্টমস অ্যাসাসমেন্ট যখন রেফারেন্স ভ্যালু বা ওভার-ভ্যালুয়েশনের ওপর ভিত্তি করে হয়, তখন পুরো ইকোসিস্টেমটাই বিষাক্ত হয়ে যায়। রিস্ক মডিউল তখন কার সাথে কাকে মেলাবে? সে দেখবে কাস্টমসের ভ্যালু বেশি, ব্যাংকের ভ্যালু কম। ব্যাস! সাথে সাথে তোকে 'মানিলন্ডারিং' বা 'কর ফাঁকি'র তকমা দিয়ে দেবে। অথচ অপরাধটা কিন্তু তুই করিসনি, অপরাধটা করেছে তোদের ওই ত্রুটিপূর্ণ 'রেফারেন্স ভ্যালু' সিস্টেম!
কদম আলী:(মাথায় হাত দিয়ে) তার মানে, সরকার ডাটা মেলালেও সেটা হবে একটা ভুল ডাটার মিলনমেলা?
এলিয়েন কদম:ঠিক তাই। এটাকে আমরা মহাকাশ বিজ্ঞানে বলি ফেক সিঙ্ক্রোনাইজেশন'। তুই যদি ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটা নিখুঁত বিল্ডিং বানাস, তবে সেই বিল্ডিং কোনো একদিন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বেই। তোদের এনবিআর ব্যবসায়ীদের পেমেন্ট ডাটাকে সম্মান না দিয়ে যখন নিজেদের তৈরি করা কাল্পনিক মূল্যে ট্যাক্স নেয়, তখন থেকেই দুর্নীতির বীজ বপন করা হয়।
কদম আলী:কিন্তু এলিয়েন ভাই, ওরা পেমেন্ট বেসড কেন করে না? সব তো ব্যাংকের মাধ্যমেই হয়!এলিয়েন কদম:(কণ্ঠ নিচু করে) কারণ পেমেন্ট বেসড করলে তো আর দরকষাকষির সুযোগ থাকে না। রেফারেন্স ভ্যালু থাকলে অফিসারদের হাতে একটা 'অস্ত্র' থাকে। তারা যখন খুশি ভ্যালু বাড়িয়ে দিতে পারে, আবার "অন্য উপায়ে" খুশি করলে ভ্যালু কমিয়েও দিতে পারে। এই যে ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা—এটাই তো তোদের সিস্টেম ট্রাস্টের প্রধান শত্রু। সিস্টেম যদি পেমেন্ট বেসড হতো, তবে রিস্ক মডিউল অটোমেটিক কাজ করত। কারো হস্তক্ষেপ লাগত না।
কদম আলী:বন্ধু, তুই তো আজ আমার চোখ দিয়ে রক্ত ঝরিয়ে দিলি। আমি ভাবছিলাম রিস্ক মডিউল আসুক, ডিজিটাল হোক। এখন দেখছি ভিত্তি যদি পেমেন্ট বেজড না হয়, তবে এই ডিজিটালাইজেশন হলো আরও বড় একটা খাঁচা!
এলিয়েন কদম:শোন কদম, তোদের এই দেশে  System Trust এর দাবিটা আরও জোরালো করতে হবে। সবাইকে বলতে হবে— কাস্টমস অ্যাসাসমেন্ট হতে হবে পেমেন্ট ডাটা অনুযায়ী। রেফারেন্স ভ্যালুর নামে এই যে ওভার-ভ্যালুয়েশন করে কর আদায় করা হচ্ছে, এটা আসলে অর্থনীতিকে একটা গাণিতিক মরীচিকার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তোদের Triple Hit" তত্ত্বে এটা হলো চতুর্থ হিট, যা আড়ালে থেকে সব ধ্বংস করছে।
কদম আলী: তুই ঠিক বলেছিস। আমাদের ব্যবসায়ীরা ওভার-ভ্যালুয়েশনের কারণে যে বাড়তি ভ্যাট দিচ্ছে, সেটার বোঝা তো সাধারণ মানুষের ওপরেই পড়ছে। আর ওদিকে রিস্ক মডিউলের ভয়ে তারা এখন তটস্থ!
এলিয়েন কদম:(ইউএফও-র দিকে এগোতে এগোতে) কদম, আমি আজ যাই। তবে একটা কথা মনে রাখিস যে সিস্টেম সত্যকে (Actual Payment) অস্বীকার করে, সেই সিস্টেমে হাজারটা মডিউল বসালেও তা কখনো ন্যায়বিচার করতে পারে না। তোদের এই সিস্টেমটা এখন অনেকটা সেই রোবটের মতো, যার চোখ নেই কিন্তু হাতে বিশাল একটা তলোয়ার আছে। সে যাকে খুশি কাটবে, আর বলবে— "আমি তো নিয়ম মানছি!"
কদম আলী: যাস না ভাই! যাওয়ার আগে বল— এই রেফারেন্স ভ্যালুর অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় কী?
এলিয়েন কদম:( মই দিয়ে ওঠার সময় হালকা হাসল) উপায় একটাই অটোমেটেড ব্যাংকিং ইন্টিগ্রেশন। যেদিন তোর এলসির ডাটা সরাসরি কাস্টমসের পোর্টালে গিয়ে কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই শুল্ক নির্ধারণ করবে, সেদিনই তোরা স্বাধীন হবি। ততক্ষণ পর্যন্ত এই 'অ্যাসাসমেন্ট' নামক জাদুর খেলা চলতেই থাকবে!
ইউএফও-টি অন্ধকারের বুক চিরে উপরে উঠে গেল। কদম আলী ছাদের রেলিং ধরে নিচে মতিঝিলের দিকে তাকালেন। কত শত ট্রাক বন্দরে মাল খালাসের অপেক্ষায়, আর কত শত ব্যবসায়ী এখন রেফারেন্স ভ্যালুর চাপে পিষ্ট। কদম আলী বিড়বিড় করে বললেন, পেমেন্ট ডাটা যেখানে তুচ্ছ, সেখানে রিস্ক মডিউল হলো কেবলই উচ্চবিলাসী কল্পনা


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উইন-উইন সমাধানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে শুল্ক-চুক্তি করতে আগ্রহী ঢ

1

বদলে যাওয়া ক্যাম্পাস

2

কর বাড়িয়ে তামাক বন্ধ সম্ভব নয়, প্রয়োজন ইনোভেটিভ আইডিয়া

3

টেসলা কিনলেও রাস্তায় চালাতে পারবেন না ট্রাম্প

4

ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন এক কথায় অবাস্তব এবং অসম্ভব: সারজিস আ

5

জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস ক্ষতি করে কিনা তা প

6

বিশ্বকাপ নিয়ে রিভালদোর সঙ্গে তর্কে জড়ালেন নেইমার

7

যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকে ঢুকলে দেখা যাচ্ছে নতুন বার্তা

8

পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে পরিবেশ সংরক্ষণ জরুরি: ড. ফরহিনা

9

শরীয়তপুর সাংবাদিক সমিতির সভাপতি পলাশ, সম্পাদক মামুন

10

প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন এই তারকারাও

11

মধ্যরাতে বরখাস্ত চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার

12

‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ চাইছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা

13

অগ্নিকাণ্ডের ৫ দিন পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ

14

২০% প্লাস্টিক কারখানা বন্ধের পথে, ভ্যাট কমানোর দাবি মালিকদে

15

সেমিকন্ডাক্টর খাতের বিকাশে টাস্কফোর্স গঠন, সদস্য ১৩ জন

16

কর্মবিরতি প্রত্যাহার, কাজে ফিরেছেন বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচা

17

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি: তদন্তভার সিআইডি থেকে নিতে চা

18

প্রধান উপদেষ্টাকে মার্চে বেইজিং সফরে নিতে আগ্রহী চীন

19

আমি চুয়েটের শিক্ষার্থী, তাই আবেগ ও দায়বদ্ধতাও বেশি : চুয়েটের

20